স্বজনদের সহযোগিতায় কাটছে আল্পনার মেডিকেলে পড়ার বাধা
আসাদুল ইসলাম দুলাল: লাখের বেশি শিক্ষার্থীর ভিড়ে মেধা ও শ্রমের সমন্বয়ে ২০২১-২২ সেশনের মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় সরকারি মেডিকেলে পড়ার সুযোগ পেয়েছেন ঠাকুরগাঁওয়ের মেয়ে আল্পনা আক্তার। প্রাপ্ত স্কোর অনুযায়ী তিনি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন।
আর্থিক টানাপোড়েন এই মেধাবী শিক্ষার্থীর চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন পূরণে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তবে ভবিষ্যতে গাইনোকোলজিস্ট হতে আগ্রহী আল্পনার স্বজনেরা তার পড়াশোনার দায়িত্ব নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। এতে তার পরিবারে নেমে এসেছে স্বস্তির সুবাতাস।
আল্পনা আক্তারের জন্ম ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার বড়পলাশবাড়ী ইউনিয়নের ধারিয়া বেলসাড়া গ্রামে। চার ভাই-বোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়। শিক্ষাজীবনে সকল পরীক্ষায় গোল্ডেন এ প্লাস পেয়েছেন এই কৃতি শিক্ষার্থী। মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন এবারের মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায়ও।
মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার উত্তীর্ণ হওয়ার অনুভূতি সম্পর্কে জানতে চাইলে আল্পনা আকতার আজ শুক্রবার (৮ এপ্রিল) মেডিভয়েসকে বলেন, ‘আমি মেডিকেলে ভর্তির সুযোগ পেয়ে খুবই আনন্দিত। মা-বাবা ও শিক্ষকদের ইচ্ছা পূরণ করতে পেরেছি, এবং তারাও খুব খুশি হয়েছেন।’
মেডিকেলে ভর্তির প্রস্তুতি বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, লকডাউনের পর স্কুল কলেজ খোলার পর শিক্ষকদের পরামর্শ এবং মেডিকেলের অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের কাছে থেকে ধারণা নিয়ে লেখা-পড়া শুরু করি। এইচএসসি পরীক্ষা দেওয়ার পর অনলাইনে ক্লাসগুলো অনুসরণ করতাম। পাশাপাশি বিজ্ঞান বিভাগের বইগুলো ভালো মতো বুঝে-শুনে পড়া শুরু করি। মেডিকেলের প্রশ্নের ধরনটা নিজে নিজে পড়ে বুঝতে সক্ষম হই। অনেকে পরীক্ষা দেওয়ার সময় চিন্তা করেন, পরীক্ষায় এতো শিক্ষার্থীদের মধ্যে কিভাবে টিকবে? কিন্তু আমি চিন্তা করতাম, ভাল মতো পরীক্ষা দিয়ে ভাল নম্বর কিভাবে তুলবো। এই চিন্তা করে প্রস্তুতি নিই।’
মানবিক থেকে বিজ্ঞানে ভর্তি
চিকিৎসক হওয়ার অনুপ্রেরণা প্রসঙ্গে তিনি জানান, ‘ছোটবেলা থেকে স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হওয়ার। বাবা-মা আমার আগ্রহটাকে প্রাধান্য দেন। আর তাদের স্বপ্নকে নিজের স্বপ্ন বলে মনে করতাম। শুরুতে নবম শ্রেণিতে মানবিক শাখায় ভর্তি হলেও শিক্ষকদের ও পরিবারের অনুপ্রেরণায় শাখা পরিবর্তন করে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হই। তখন থেকে তাদের অনুপ্রেরণায় মেডিকেলে পড়ার স্বপ্ন দেখি এবং সেই স্বপ্ন এইচএসসি পরীক্ষা দেওয়ার পর বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করে।’
আল্পনা আকতার বলেন, ‘পঞ্চম, অষ্টম, এসএসসি ও এইচএসসিতে গোল্ডেন ‘এ’ প্লাস পেয়েছি। ছোট বেলা থেকেই লেখা পড়ায় মনোযোগী ছিলাম। নবম শ্রেণিতে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হওয়ার পর থেকে স্যারদের ও পরিবারের ইচ্ছায় আমি ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখি। কলেজে পড়া অবস্থায় সেই ইচ্ছাটা আরও বেড়ে যায়। এইচএসসি পাস করার পর কোচিং সেন্টারে ভর্তি হই।’
এদিকে কোনো জমি না থাকলেও উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করার স্বপ্নে বিভোর বাবা আফতাবর রহমান। পেশায় ভ্যান চালক বাবার সম্পদ বলতে শুধু বসতভিটা। একমাত্র ছেলে মুন্না আলী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করছেন।
এ বিষয়ে আফতাবর রহমান মেডিভয়েসকে বলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ। মেয়ে মেডেকেলে ভর্তির সুযোগ পাওয়ায় আমরা খুব খুশি হয়েছি। গ্রামের লোক খুব খুশি হয়েছে।’
সন্তানদের পড়াতে আবাদি জমি বিক্রি
তিনি আরও বলেন, ‘আমার তিন মেয়ে এক ছেলে। বড় মেয়ের বিয়ে দিয়েছি। আর একমাত্র ছেলে মুন্না আলী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের অনার্স চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী। তৃতীয় মেয়েটি এবার মেডিকেলে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে এবং ছোট মেয়ে কলেজে পড়ছে। অনেক কষ্ট করে ছেলেকে ঢাবিতে ও মেয়েদের পড়াচ্ছি। ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনা ও মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার সময় ২৫ শতক আবাদি জমি বিক্রি করি। পড়াশোর খরচ চালাতে ছেলেকে প্রতি মাসে ছেলেকে তিন হাজার টাকা পাঠাতে হয়। পাশাপাশি অন্য দুই মেয়ের পড়ার খরচের ব্যয়ভার বহন করছি এই উপার্জনের মাধ্যমে।’
তিনি আরও জানান, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকে দুই সন্তান পড়াশোনার সময় শিক্ষাবৃত্তি পায় এক্সিম ব্যাংক থেকে। এ ছাড়া মেয়েকে ভর্তি করানোর টাকা যোগাড় করতে ইতোমধ্যে তিনি তাঁর নিকট আত্মীয়দের সাথে কথা বলছেন। তারা ভর্তির জন্য টাকা দিয়ে সহযোগিতা করার আশ্বাস দিয়েছেন। এজন্য অনেকটা দুশ্চিন্তামুক্ত তিনি।